“২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি স্কুলে ভর্তি নীতিমালা : বয়স, কোটা, লটারি, পছন্দক্রম, ক্যাচমেন্ট—সবকিছুর সম্পূর্ণ গাইডলাইন”
ভূমিকা: কেন সরকারি স্কুলে ভর্তি নীতিমালা এত গুরুত্বপূর্ণ?
প্রতিবছর সরকারি স্কুলে ভর্তির মৌসুম এলেই অভিভাবকদের উদ্বেগ, দৌড়ঝাঁপ, নির্ঘুম রাত শুরু হয়। বিশেষ করে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর এলাকায় একটি আসনের জন্য কয়েক হাজার আবেদনকারীর প্রতিযোগিতা—এ যেন এক ধরনের বার্ষিক যুদ্ধ। এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য নতুন ভর্তিনীতিমালা চূড়ান্ত করেছে, যা ১৩ নভেম্বর প্রকাশিত হয়েছে।
এ নীতিমালা শুধু বয়সসীমা বা কোটা বণ্টন নয়; বরং পুরো ভর্তি প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর, হয়রানিমুক্ত এবং ছাত্রবান্ধব করার একটি বড় পদক্ষেপ। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বয়সভিত্তিক ভর্তি নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মাধ্যমে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ—সবকিছুই নতুন নীতিমালায় আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।

এই দীর্ঘ বিশ্লেষণধর্মী আর্টিকেলে আমরা দেখব—
- নতুন বয়সসীমা কী এবং কেন এটি কঠোরভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে
- ক্যাচমেন্ট এরিয়া কীভাবে কাজ করে
- বিভিন্ন কোটা কীভাবে বণ্টিত হবে
- পছন্দক্রম নির্ধারণে নতুন বাধ্যতামূলক শর্ত
- ডিজিটাল লটারি পদ্ধতির সুবিধা
- সম্ভাব্য সময়সূচি
- অভিভাবকদের অভিযোগ—৬৩% কোটা বিতর্ক
- এই নীতিমালা শিক্ষায় কী প্রভাব ফেলবে
এছাড়া শেষে থাকবে ১০টি সাধারণ প্রশ্নোত্তর (FAQ) এবং তাদের স্পষ্ট, ব্যবহারযোগ্য উত্তর।
চলুন শুরু করি বিস্তারিত আলোচনা।
১. কোন কোন শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে?
নীতিমালা অনুযায়ী সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ভর্তি নেওয়া যাবে। অর্থাৎ—
- প্রথম শ্রেণি – নতুন ভর্তি
- দ্বিতীয়–নবম শ্রেণি – শূন্য আসনের ভিত্তিতে ভর্তি
- একাদশ শ্রেণির ভর্তি আলাদা নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়, এটি তার বাইরে।
এতে সবচেয়ে বেশি ভিড় থাকে—
১ম, ৬ষ্ঠ এবং ৯ম শ্রেণিতে।
কারণ—
এই তিন শ্রেণি হলো “transition point”।
২. বয়সসীমা—এটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
বয়সসীমা নির্ধারণ ভর্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। নীতিমালা অনুযায়ী—
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বয়সসীমা
- সর্বনিম্ন বয়স: ৫ বছর (১ জানুয়ারি ২০২১ বা এর আগের জন্ম)
- সর্বোচ্চ বয়স: ৭ বছর (৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ বা এর পরের জন্ম)
এর মানে:
২০২৬ সালে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে হলে শিশু জন্ম নিতে হবে—
➡ ১ জানুয়ারি ২০১৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২১ সময়ের মধ্যে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে—
“জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী ৬ বছরের বেশি বয়সীদের প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে; কিন্তু প্রথম শ্রেণির ক্ষেত্রে একটি গ্রহণযোগ্য বয়সসীমা নির্ধারণ জরুরি।”
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (Special Needs) শিক্ষার্থীদের জন্য
৫ বছরের অতিরিক্ত বয়সসীমা প্রযোজ্য।
অর্থাৎ তারা সর্বোচ্চ ১২ বছর বয়সেও প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারবে।
৩. বয়স যাচাইয়ের জন্য বাধ্যতামূলক দলিল
অনলাইন ভর্তি ফরমের সঙ্গে জমা দিতে হবে—
✔ জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত কপি
✔ এটি অবশ্যই অনলাইন জন্ম নিবন্ধন (BDRIS) হতে হবে
✔ হাতে লেখা বা ইউনিয়ন পরিষদের পুরনো সংস্করণ গ্রহণযোগ্য নয়
এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কারণ:
- বয়স জালিয়াতি রোধ করা
- ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো
- স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে বয়স যাচাই সহজ করা
৪. ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের সময়সীমা কী?
২০২৬ শিক্ষাবর্ষ হবে—
➡ ১ জানুয়ারি ২০২৬ – ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬
স্কুলগুলোতে এবার পুরো বছরের পরিকল্পনা হবে ক্যালেন্ডার ইয়ার ভিত্তিতে। এটি শিক্ষাবর্ষকে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে।
৫. প্রতি শাখায় শিক্ষার্থী সংখ্যা সীমা
প্রতিটি শ্রেণির প্রতিটি সেকশনে সর্বোচ্চ—
✔ ৫৫ জন শিক্ষার্থী
কেন সীমা করা হলো?
- ক্লাসরুমে শিক্ষকের সেবা নিশ্চিত
- অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে শিক্ষার মান কমে যাওয়া রোধ
- শিশুদের প্রতি যথাযথ মনোযোগ নিশ্চিত
৬. পছন্দক্রম (Choice Preference) — নতুন বাধ্যতামূলক শর্ত
এবারের নীতিমালায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এটি।
একজন শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি বিদ্যালয় পছন্দ করতে পারবে।
❗ডাবল শিফট স্কুলের নিয়ম
যদি কোনো স্কুলে—
- সকাল শিফট
- দিন শিফট
দুই শিফট থাকে এবং শিশু দুটি শিফটই বেছে নেয়, তাহলে—
➡ এটি দুটি পছন্দ হিসেবে ধরা হবে।
নতুন বাধ্যতামূলক শর্ত
সফটওয়্যারে শিক্ষার্থীকে অবশ্যই—
➡ একটি প্রতিষ্ঠান চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করে লক করতে হবে
এর উদ্দেশ্য—
- একই শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন স্কুলে এলোমেলোভাবে নির্বাচন হওয়া রোধ
- অন্য আবেদনকারীদের আসন খালি রাখা
- প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জটিলতা কমানো
৭. ক্যাচমেন্ট এরিয়া—সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ
ঢাকা মহানগরের ৪৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে।
প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান সর্বোচ্চ তিনটি থানা ক্যাচমেন্ট হিসেবে নির্ধারণ করতে পারবেন।
ক্যাচমেন্ট কোটায় মোট আসনের ৪০% সংরক্ষিত
সমালোচনার কারণ—
- ঢাকার বাইরে থেকে নতুন আসা পরিবার
- ভাড়া বাসায় থাকা কর্মজীবী অভিভাবক
- প্রবাসফেরত পরিবার
তারা বলে থাকেন—
“আমরা ক্যাচমেন্ট ছাড়া কীভাবে সরকারি স্কুলে ভর্তি হব?”
সরকারের যুক্তি
- ভিড় ও বিশৃঙ্খলা কমানো
- যাতায়াত সংকট কমানো
- শিশুদের নিরাপদ দূরত্বে স্কুলে পৌঁছানো নিশ্চিত
- স্থানীয়তার ভিত্তিতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত
৮. কোটা বণ্টন—২০২৬ সালের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
নতুন নীতিমালায় কোটাগুলি হলো—
| কোটা | শতাংশ |
| ক্যাচমেন্ট এরিয়া | ৪০% |
| মুক্তিযোদ্ধা সন্তান | ৫% |
| বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন | ২% |
| শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা | ০.৫% |
| দপ্তর–সংস্থার কর্মকর্তা | ০.৫% |
| যমজ কোটা | ২% |
| সহোদর কোটা | ৩% |
| সরকারি প্রাথমিক থেকে ৫ম পাস (৬ষ্ঠ শ্রেণি) | ১০% |
আগের তুলনায় পরিবর্তন:
- যমজ কোটা কমেছে
- সহোদর কোটা বেড়েছে
- মন্ত্রণালয় ও দপ্তর-সংস্থার কোটায় পৃথক বরাদ্দ যুক্ত হয়েছে
যমজ ও সহোদর কোটার সীমা
➡ এক দম্পতির সর্বোচ্চ ৩ সন্তান পর্যন্ত কার্যকর।
৯. আবেদন ও ডিজিটাল লটারির সম্ভাব্য সময়সূচি
(মাউশির সভায় নির্ধারিত)
| ধাপ | সম্ভাব্য তারিখ |
| ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ | ১৯ নভেম্বরের মধ্যে |
| অনলাইন আবেদন শুরু | ২১ নভেম্বর |
| আবেদন গ্রহণ শেষ | ৭ ডিসেম্বর |
| ডিজিটাল লটারি | ১৪ ডিসেম্বর |
| নির্বাচিতদের ভর্তি | ১৭–২১ ডিসেম্বর |
ডিজিটাল লটারি কেন্দ্রীয়ভাবে মাউশি পরিচালনা করবে। সফটওয়্যার ও ডেটা সিকিউরিটি কঠোরভাবে নিশ্চিত থাকবে।
১০. ৬৩% কোটা বিতর্ক—অভিভাবকদের উদ্বেগ
মোট কোটার পরিমাণ—
➡ ৬৩%
(যা ক্যাচমেন্ট + অন্যান্য কোটার যোগফল)
অনেকে বলে থাকেন—
- “এত বেশি কোটা সাধারণ অভিভাবকদের ক্ষতি করে।”
- “ঢাকায় চাকরি বদল করলে ক্যাচমেন্ট বদলে যায়—এটি বাস্তবসম্মত নয়।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা
- ক্যাচমেন্ট ছাড়া ভর্তি করলে ভিড় সামলানো অসম্ভব
- স্থানীয় শিশুদের নিরাপত্তা ও সুবিধা বিবেচনায় রাখতে হয়
- অন্যান্য কোটার হার খুবই সীমিত (মোট ২৩%)
১১. নতুন নীতিমালা—শিক্ষা ব্যবস্থায় সম্ভাব্য প্রভাব
✔ ইতিবাচক প্রভাব
- ভর্তি প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ
- বয়স জালিয়াতি কমবে
- শিক্ষা ব্যবস্থায় সমতা আসবে
- এলাকার স্কুলে পড়ার প্রবণতা বাড়বে
- অনলাইন পদ্ধতিতে হয়রানি ও দালাল কমবে
✔ চ্যালেঞ্জ
- ক্যাচমেন্ট সমস্যার কারণে ঢাকায় নতুন আসা পরিবারের অসুবিধা
- আবেদন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে অনেকেই অসুবিধায় পড়েন
- পছন্দক্রম “লক” করার নিয়ম নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি
১২. সিদ্ধান্ত: অভিভাবকদের করণীয়
- আবেদন করার আগে সন্তানের বয়সসীমা যাচাই করুন
- জন্ম নিবন্ধন সঠিক আছে কি না নিশ্চিত করুন
- পছন্দক্রম ঠিকভাবে নির্ধারণ করুন
- লটারি সম্পর্কিত SMS/নোটিস নিয়মিত দেখুন
- ক্যাচমেন্ট এরিয়া আগে থেকেই চেক করুন
আপনার সুবিধার জন্য শেষে FAQ যোগ করা হলো।
Frequently Asked Questions (FAQ) + Answer
১) প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে শিশুর বয়স কত হতে হবে?
উত্তর: ৫–৭ বছরের মধ্যে হতে হবে (জন্মসন: ১ জানুয়ারি ২০১৯–৩১ ডিসেম্বর ২০২১)।
২) আবেদন কোথায় করতে হবে?
উত্তর: মাউশি নির্ধারিত অনলাইন পোর্টাল (ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ থাকবে)।
৩) জন্ম সনদ কী ধরনের হতে হবে?
উত্তর: BDRIS অনলাইন জন্ম নিবন্ধন। হাতে লেখা বা পুরনো কপি গ্রহণযোগ্য নয়।
৪) কতটি স্কুল নির্বাচন করা যাবে?
উত্তর: সর্বোচ্চ পাঁচটি। ডাবল শিফট হলে দুইটি পছন্দ গণ্য হবে।
৫) লটারি কবে হবে?
সম্ভাব্য তারিখ: ১৪ ডিসেম্বর।
৬) ক্যাচমেন্ট এরিয়া কী?
বিদ্যালয় সংলগ্ন সর্বোচ্চ তিনটি থানা, যেখানে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের জন্য ৪০% কোটা সংরক্ষিত।
৭) কোটাগুলো কি বাধ্যতামূলক?
হ্যাঁ, নীতিমালা অনুযায়ী কোটা সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক।
৮) যমজ কোটা কীভাবে কাজ করে?
এক দম্পতির সর্বোচ্চ তিন সন্তানের জন্য প্রযোজ্য; ২% আসন সংরক্ষিত।
৯) সহোদর কোটা কী?
যদি কোনো ভাই/বোন একই স্কুলে আগে থেকেই পড়ে, তখন ৩% আসন সংরক্ষিত।
১০) লটারিতে নির্বাচিত হলে কীভাবে ভর্তি হব?
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা তারিখ (১৭–২১ ডিসেম্বর) এর মধ্যে বিদ্যালয়ে সরাসরি গিয়ে ভর্তি সম্পন্ন করতে হবে।
আরো দেখুনঃ Best AI Content Creation Tools in 2025 । সেরা এআই কনটেন্ট টুলস
Content Creation with AI Tools – Modern Guide 2025 কনটেন্ট নির্মাণে এআই
অনলাইন ব্যবসা শুরুর গাইড Online Business Shuru Guide-2025
আমাদের ইউটিউব চ্যানেল ভিজিট করুন এখানে ক্লিল করে
সরকারি স্কুল ভর্তি ২০২৬, ভর্তি নীতিমালা ২০২৬ ,স্কুল ভর্তি বয়সসীমা, ক্যাচমেন্ট এরিয়া কী, ডিজিটাল লটারি স্কুল ভর্তি, সরকারি মাধ্যমিক স্কুল ভর্তি, স্কুল ভর্তি কোটা , সরকারি স্কুলে ভর্তির নিয়ম, অনলাইন আবেদন, স্কুল ভর্তি মাউশি , ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ,স্কুল ভর্তি সময়সূচি, সরকারি স্কুল ভর্তি প্রক্রিয়া, সরকারি স্কুলে আবেদন, ঢাকা স্কুল ক্যাচমেন্ট, ভর্তি লটারি ফলাফল, প্রথম শ্রেণি ভর্তি ২০২৬, ষষ্ঠ শ্রেণি ভর্তি নিয়ম ভর্তি ফি ও সময়সূচি, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন কোটা যমজ ও সহোদর কোটা, সরকারি স্কুলে ভর্তি নীতিমালা


